জেনে নিই হজ্জ ও উমরা এর বিস্তারিত(পর্ব ৬)।

হজ্জ-হাজী-muslimpoint
পর্ব ৬ঃ

 ✅ঢাকা হজ ক্যাম্প
============

হজ ক্যাম্প দূর থেকে আগত হজযাত্রীদের আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে দলে দলে হজযাত্রীরা এসে ১/২ দিন থাকেন এবং ফ্লাইটের শিডিউল অনুযায়ী হজ ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান।

আপনার হজ এজেন্সি হজ ক্যাম্পে আপনার থাকার জন্য ছোট ছোট ডরমেটরি রুম এর ব্যবস্থা করতে পারেন ২য়/৩য় তলায়। হজ ক্যাম্পের নিচ তলা অফিসিয়াল কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

এখানে আপনার হজ এজেন্সি, হজ ক্যাম্পের অফিস থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা করবেন ও হজ ফ্লাইটের শিডিউল চেক করবেন। কেউ যদি মেনিনজাইটিস টিকা না নিয়ে থাকেন তবে এখান থেকে টিকা নিতে পারেন।

এখানে কিছু খাবার ক্যান্টিন ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে। আপনি অথবা আপনার হজ এজেন্সি এখান থেকে খাবার এর ব্যবস্থা করতে পারেন। আপনি এখানে কিছু মানি এক্সচেঞ্জার পাবেন এবং চাইলে টাকা রিয়াল করে নিতে পারেন।

এখানে কিছু হজ প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করতে পারেন। এখানে মক্কা, মদীনা ও মিনার তাবুর মানচিত্র বিতরণ করা হয় যা সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন।

হজ ক্যাম্পে থাকার সময় সতর্ক থাকুন কারণ এখান থেকে অনেক সময় টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী হারিয়ে অথবা চুরি হয়ে যায়।

মনে রাখবেন হজ ক্যাম্প একটি ধুমপান মুক্ত এলাকা, এখানে অপনার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনরা আপনার সাথে দেখা করতে পারেন নিচ তলায়; তবে তাদের ২য়/৩য় তলায় ডরমেটরি রুম এ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।

ফ্রি সৌদি মোবাইল সিমকার্ড (মোবিলি, জেইন) পাওয়া যায় এখানে অথবা আপনি মোবাইল সিমকার্ডও কিনতে পারেন।

 ✅বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন
==================

হজ যাত্রার প্রস্থান প্রক্রিয়ার কাজ (বড় ব্যাগ জমা করণ, বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন) ঢাকা হজ ক্যাম্প থেকে শুরু হতে পারে আবার বিমান বন্দর থেকেও শুরু হতে পারে, এটা নির্ভর করে বিমান কর্তৃপক্ষ ও সরকার এর সিদ্ধান্তের উপর। সাধারণত বাংলাদেশ বিমান এর প্রস্থান প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয় ঢাকা হজ ক্যাম্প থেকে এবং সৌদি এয়ারলাইনস-এর কাজ শুরু হয় ঢাকা বিমানবন্দর থেকে।

আপনি যদি ঢাকা শহরের মধ্য থেকে সরাসরি আসেন তবে আপনার হজ এজেন্সির সাথে কথা বলে জেনে নিন আপনার ফ্লাইট কোন এয়ারলাইনসে এবং আপনাকে প্রথমে কোথায় রিপোর্ট করতে হবে – ঢাকা হজ ক্যাম্প নাকি বিমান বন্দর। এখানে আমরা ধরে নিয়েছি আপনি প্রথমে ঢাকা হজ ক্যাম্পে এসেছেন কারণ বেশিরভাগ হজযাত্রী হজ ক্যাম্প হয়ে বিমানে উঠেন।

কোথায় যাচ্ছেন? আরো নতুন কিছু জানার জন্য এই লেখাটি পড়ুনঃ   জেনে নিই হজ্জ ও উমরা এর বিস্তারিত ।

যখন ফ্লাইটের সময় নিকটবর্তী হবে -সাধারণত ফ্লাইটের ৫/৬ ঘন্টা আগে হজ ক্যাম্পে ও বিমানবন্দরে বিমান শিডিউল এর ঘোষণা হবে তখন আপনি আপনার ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হন।

আপনার হজ এজেন্সির পরিকল্পনা অনুসারে আপনি যদি প্রথমে মক্কায় যান তাহলে আপনার বাড়ি থেকে অথবা হজ ক্যাম্প অথবা বিমানবন্দর থেকেই শুধু ইহরামের কাপড় পরে নিবেন কিন্তু নিয়ত বাকি রাখবেন। তবে ইহরামের কাপড় আপনি বিমানের ভেতরেও পরতে পারবেন। পৃষ্ঠা নং …. থেকে আপনি ইহরামের তাৎপর্য ও বিধি-বিধান বিস্তারিত জানতে পারবেন।

আপনি যদি প্রথমে মদীনায় যান তাহলে ইহরামের কাপড় পরিধান করার দরকার নেই। সাধারণ কাপড় পরিধান করে যাবেন। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ হজযাত্রী প্রথমে মক্কা যান ও উমরাহ পালন করেন তাই এখানে ধরে নিচ্ছি আপনি প্রথমে মক্কায় যাচ্ছেন।

বিমানে ইহরামের কাপড় পরা দৃষ্টিকটু ও কঠিন কাজ। তাই বিমানে আরোহণের পূর্বেই ইহরামের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিবেন মানে ইহরামের কাপড় পড়ে নিবেন। শুধুমাত্র নিয়তটা বাকি রাখবেন। ইহরাম করবেন বা নিয়ত করবেন যখন আপনি মিকাত এর কাছাকাছি পৌছাবেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মীকাতের কাছাকাছি পৌছানোর পূর্বে ইহরামের নিয়ত করেন নি।[1]

হজ ক্যাম্পে অথবা বিমানবন্দরে আপনার দলনেতা বা আমীরের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমে লাইন ধরে বিমান টিকেট হাতে নিয়ে কাষ্টমস ও ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে ব্যাগ জমাকরণ কাউন্টারে আপনার বড় ব্যাগটি জমা দিয়ে দিন। এখানে আপনার বিমান টিকেট চেক করা হবে এবং আপনার লাগেজে স্টিকার লাগিয়ে বিমানের কার্গোতে জমা করা হবে। এখানে আপনাকে বোর্ডিং পাস দেওয়া হবে। যত্নসহকারে বোর্ডিং পাসটি সংরক্ষণ করুন।

এরপর ইমিগ্রেশন অফিসের দিকে অগ্রসর হউন এবং লাইনে দাঁড়ান। ইমিগ্রেশন অফিসার আপনার পাসপোর্ট চেক করবেন এবং সিল দিবেন, তিনি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন, আপনার অফিস অনাপত্তিপত্র (NOC) দেখতে পারেন। ইমিগ্রেশন-এর কাজ শেষ হলে হজযাত্রী অপেক্ষা কক্ষে গিয়ে বসুন। মনে মনে দো‘আ ও যিকির করুন। এরপর হজ ক্যাম্পে হজযাত্রী পরিবহন বাস এসে হাজীদের বিমানবন্দর নিয়ে যাবে।

কোথায় যাচ্ছেন? আরো নতুন কিছু জানার জন্য এই লেখাটি পড়ুনঃ   জেনে নিই হজ্জ ও উমরা এর বিস্তারিত(পর্ব ৯)।

[1] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮

✅ঢাকা বিমানবন্দর
============

বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট একটি কাউন্টারে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আপনার বোর্ডিং পাস দেখিয়ে আপনার ছোট ব্যাগপত্র চেক করিয়ে অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট অপেক্ষা কক্ষে গিয়ে বসুন।

বিমানবন্দরে হাজীদের জন্য আপ্যায়ন হিসাবে কখনো কখনো বিভিন্ন মহল থেকে খাবার ও পানীয় দেওয়া হয়। এগুলো রাখতে পারেন।

হজের যাত্রায় আপনার সঙ্গে অবশ্যই ছোট হাত ব্যাগ/সৈনিক ব্যাগ/কোমরের ব্যাগ নেবেন। এ ব্যাগে টাকা, পাসপোর্ট, টিকেট, ওষুধ ও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র রাখবেন।

ফ্লাইটের সময় নিকটবর্তী হলে আবার শৃংখলাবদ্ধ হয়ে লাইনে দাঁড়াবেন এবং লাইন ধরেই বিমানে উঠে পড়বেন। একটি সর্তকতা; সবসময় দলবদ্ধ হয়ে সকল জায়গায় যাবেন এবং সকল কাজ করবেন। কখনই দলছাড়া হবেন না, দলছাড়া হলে আপনি হারিয়ে যেতে পারেন ও সমস্যায় পড়তে পারেন।

 ✅বিমানের ভেতরে
============

বিমানে উঠে আপনার নির্দিষ্ট আসন অথবা যদি ফ্রি সিটিং বলা হয় তখন যে কোনো আসনে আসন গ্রহণ করুন। আপনার মাথার উপরের বক্সে আপনার ছোট হাত ব্যাগটি রাখুন।

বিমানে উাঠার পর আপনার পরিচিতজনদের ফোন করে আপনার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করুন ও এরপর মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে রাখুন অথবা উড্ডয়নের আগে এয়ারপ্লেন মোড দিয়ে রাখুন। আপনার সিটটি সোজা করে রাখুন এবং সিট বেল্ট বেঁধে নিন। এখন যাত্রা পথের দো‘আটি পড়তে পারেন।

বিমানের ক্রুদের ঘোষিত নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। বিমান ক্রু যখন যাত্রী সংখ্যা গণনা করবেন তখন আপনি সিটে বসে থাকুন।

সাধারণত হজ ফ্লাইটে ২তলা বিশিষ্ট বোয়িং ৭৪৭/৭৭৭ বিমান ব্যবহৃত হয়। এক একটি বিমান ৪৫০-৫৫০ জন যাত্রী বহন করতে পারে।

বিমান উড্ডয়নের পর সিট বেল্ট খুলে সিটটি পিছনের দিকে হেলে দিয়ে আরাম করে বসুন অথবা ঘুমিয়ে যান। মনে মনে দো‘আ ও যিকির করুন।

বিমান সাধারণত ৬০০ মাইল/ঘন্টা বেগে ভূপৃষ্ঠ হতে ৩০,০০০ ফুট উপর দিয়ে উড়ে যাবে। সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দর পৌছাতে সময় লাগে সাধারণত ৫-৬ ঘন্টা।

বিমানের ১বার লাঞ্চ/ডিনার ও ১বার হালকা খাবার পরিবেশন করা হবে।

কোথায় যাচ্ছেন? আরো নতুন কিছু জানার জন্য এই লেখাটি পড়ুনঃ   হজ্জ ও ওমরাহ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা ।

বিমানের ওয়াশরুমে বিমানে পানি খুবই সীমিত তাই পানি বেশি খরচ করবেন না। ওয়াশরুমে অযু করবেন না এবং কমোডের ভিতরে টিস্যু ফেলবেন না।

সালাতের জন্য বিমানে তায়াম্মুম করবেন। এজন্য মাটির ইট দেওয়া হবে।

বিমান কোনো মীকাতের কাছাকাছি চলে এলে বিমান ক্রুরা আগেভাগেই জানিয়ে দেবেন। যারা প্রথমে মক্কায় যাবেন, তারা তখন মীকাত থেকে ইহরাম করবেন বা উমরাহর নিয়ত করবেন। এরপরই উমরাহ অধ্যায় থেকে আপনি ইহরাম ও উমরাহ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন।

জেদ্দা বিমানবন্দরে বিমান অবতরণের পর আপনি ছোট হাত ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে যাত্রীদের ওয়েটিং লাউঞ্জে/অপেক্ষা কক্ষে গিয়ে বসুন।

মদীনাতেও বিমানবন্দর আছে। আপনার হজ এজেন্সি যদি প্রথমে মদীনা যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন তবে হজ ফ্লাইটের শিডিউল মদীনা বিমানবন্দরেও নিতে পারেন তবে মদীনা যাওয়া সহজ হয়।

✅উমরাহ-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য
====================

উমরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত; যার অর্থ কোনো স্থানের যিয়ারত করা।

ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বছরের যে কোনো সময় মসজিদুল হারামে গমন করে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পাদন করাকে উমরাহ বলা হয়।

আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘উমরাহ; এক উমরাহ থেকে পরবর্তী উমরাহর মধ্যবর্তী সময়ে যা কিছু পাপ (সগীরা) কাজ ঘটবে তার জন্য কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত করে)’’।[1]

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘নিশ্চয় রমযান মাসের উমরাহ একটি হজের সমান’’।[2]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘রমযান মাসে উমরাহ পালন করা -আমার সাথে হজ করার ন্যায়’’। [3]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনদশায় ৪ বার উমরাহ করেছেন।[4]

মসজিদুল হারামে প্রবেশ করা থেকে শুরু করে তাওয়াফ, সা‘ঈ ও হালাল হয়ে উমরাহ সম্পন্ন করতে ২-৩ ঘন্টা সময় লাগে মাত্র।

[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৫০

[2] মিশকাত, হাদীস নং ২৫০৯

[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬ ও ৩০৩৯

[4] মিশকাত, হাদীস নং ২৫১৮

MuslimPoint Organization

About MuslimPoint Organization

MuslimPoint একটি অনলাইন ভিত্তিক ইসলামী প্রশ্নোত্তর, গ্রন্থাগার, ব্লগিং, কুরআন, হাদিস, কুইজ এবং বিষয় ভিত্তিক রেফারেন্স প্ল্যাটফর্ম।

View all posts by MuslimPoint Organization →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *