জেনে নিই হজ্জ ও উমরা এর বিস্তারিত ।

হজ্জ
পর্ব ১ঃ

বাংলাদেশ থেকে সরকারি অথবা বেসরকারীভাবে যারা হজে যাবেন তারা এ গাইডে তাদের প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্যাদি সংক্ষিপ্তাকারে পাবেন।

হজ ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট ইবাদাতগুলোর অন্যতম। কোনো ইবাদত কবুলের জন্য ৩টি শর্ত পূরণ প্রযোজ্য –

(১) আল ঈমান: ঈমানের সকল বিষয়ের ওপর সঠিক বিশ্বাস (সহীহ আকীদা) স্থাপন করা।
(২) আল ইখলাস: নিয়ত ও ইবাদত একমাত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের জন্য করা।
(৩) ইত্তিবাউস সুন্নাহ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ প্রদত্ত যে শরী‘আত নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণের মাধ্যমে করা।

বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন মাযহাব, দল ও মতের অনুসারীরা হজ পালনের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করলেও হজের মৌলিক বিধি-বিধান প্রায় সকলেরই এক।

এদের মধ্যে কে সঠিক আর কে সঠিক নয় সেটি নিরুপণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কুরআন ও সহীহ হাদীসের তথ্যসূত্র দিয়ে আমি এমন একটা পন্থা দেখিয়ে দিতে চেষ্টা করবো যে উপায়ে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ করেছেন এবং তাঁর সাহাবীগণ হজ পালন করেছেন। দীনের জ্ঞান শিক্ষা করা সকলের ওপর ফরয। তাই আমি আমার বইটি পড়ার অনুরোধ করবো এবং পাশাপাশি অন্য লেখকের আরো বই পড়ার পরামর্শ দিব। এরপর আপনার নিজস্ব জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দিয়ে যাচাই বাছাই করে যেটি সঠিক মনে হবে আপনি সেটিকে অনুসরণ করুন। কারো জ্ঞানের ওপর নির্ভর না করে আপনি নিজে জ্ঞান অর্জন করুন এবং তারপর আমল করুন। যতই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকের সাথে আপনি হজে যান না কেন কেউ আপনাকে ত্রুটিহীন হজ করার বা মাকবূল হজের নিশ্চয়তা দিবে না। তাই নিজ হজ নিজ জ্ঞানের ভিত্তিতে করুন এবং নিজে আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকুন।

আমার প্রত্যাশা -বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন হজ এজেন্সিগুলো তাদের হজ প্রশিক্ষণ গাইড হিসেবে এ গাইডটি ব্যবহার করবেন।

 ✅হজের তাৎপর্য
===========
হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বুনিয়াদি স্তম্ভ।

হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ; সংকল্প করা বা ইচ্ছা করা।

আল্লাহর নির্দেশ মেনে ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সৌদি আরবের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে সফর করা এবং ইসলামী শরী‘আহ অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পাদন করার নামই হজ।

কোথায় যাচ্ছেন? আরো নতুন কিছু জানার জন্য এই লেখাটি পড়ুনঃ   পুরুষের জন্য লাল ও হলুদ রংয়ের পোশাক পরিধান করা কি সত্যিই হারাম? সঠিক তথ্য জেনে নিন

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ম হিজরীতে একবার স্বপরিবারে হজ পালন করেন।

৯ম বা ১০ম হিজরীতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে হজকে ফরয করা হয়।

হজ সম্পন্ন করতে জিলহজের ৮ থেকে ১৩ তারিখে মধ্যে আরবের মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে হয়।

হজ সম্পাদনের অন্যতম একটি অংশ হলো ৯ যিলহজ আরাফা ময়দানে অবস্থান করা। এ আরাফা ময়দান হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে সমগ্র মানবজাতি একত্রিত হবে সুবিস্তৃত এক ময়দানে।

হাদীসে হজযাত্রীদের আল্লাহর মেহমান হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

কুরআন মাজীদে সূরা আল-হাজ (২২ নং সূরা) নামে একটি সূরা রয়েছে, যেখানে হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচিত হয়েছে।

নারীদের জন্য হজ হলো জিহাদের সমতুল্য। আর এটি জান্নাত লাভের একটি অবলম্বনস্বরূপ।

হজ একজন মুসলিমের মাঝে শান্তি ও শুদ্ধি আনয়ন করে এবং অতীতের সকল পাপ মোচন করে দেয়।

হজ সফরে ইহরামের (কাফন) কাপড় পরে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে পরকালের পথে রওয়ানা হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

হজের সফরে আল্লাহর বিধি-নিষেধ মেনে চলা স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে যে মুমিনের জীবন লাগামহীন নয়। মুমিনের জীবন আল্লাহর রশিতে বাঁধা।

হজের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেওয়া আখেরাতের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

হজ মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী মহাজাতিতে পরিণত হতে উদ্বুদ্ধ করে।

এখন বাংলাদেশ থেকে হজ সফর সম্পাদন করতে ১৫-৪০ দিন সময় লাগে।

বর্তমানে সমগ্র পৃথিবী থেকে প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ লক্ষাধিক মুসলিম হজ পালন করেন।

 ✅✅কা‘বা ও হজের ইতিহাস
================

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿إِنَّ أَوَّلَ بَيۡتٖ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكٗا وَهُدٗى لِّلۡعَٰلَمِينَ ٩٦﴾ [ال عمران: ٩٦]
‘‘নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ইবাদত গৃহটি (কা‘বা) নির্মিত হয় সেটি বাক্কায় (মক্কায়) অবস্থিত। একে কল্যাণ ও বরকতময় করা হয়েছে এবং সৃষ্টিকুলের জন্য পথপ্রদর্শক করা হয়েছে’’। [সূরা-আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬]
বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বা কা‘বাকে বাইতুল আতীকও বলা হয়। কারণ, আল্লাহ এ ঘরকে কাফের শাসকদের থেকে স্বাধীন করেছেন। অথবা আতীক অর্থ প্রাচীন। কারণ এ ঘরটি সর্ব প্রাচীন ইবাদত ঘর। আশ্চর্যের বিষয় হলো -এ ঘরের স্থানটি পৃথিবীর ভৌগলিক মানচিত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত।
কা‘বা ঘর নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে একাধিকবার। কারও কারও মতে পাঁচবার: (১) ফিরিশতা কর্তৃক (২) আদম আলাইহিস সালাম কর্তৃক (৩) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কর্তৃক (৪) জাহেলী যুগে কুরাইশ সম্প্রদায় কর্তৃক (৫) ইবন যুবায়ের কর্তৃক। তবে বিশুদ্ধ মতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সর্বপ্রথম কা‘বা ঘর নির্মাণ করেন।
আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে বলেন,
﴿جَعَلَ ٱللَّهُ ٱلۡكَعۡبَةَ ٱلۡبَيۡتَ ٱلۡحَرَامَ قِيَٰمٗا لِّلنَّاسِ﴾ [المائ‍دة: ٩٧]
‘‘আল্লাহ কা‘বাকে সম্মানিত ঘর করেছেন, মানুষের স্থীতিশীলতার কারণ করেছেন’’। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৯৭]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَعَهِدۡنَآ إِلَىٰٓ إِبۡرَٰهِ‍ۧمَ وَإِسۡمَٰعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيۡتِيَ لِلطَّآئِفِينَ وَٱلۡعَٰكِفِينَ وَٱلرُّكَّعِ ٱلسُّجُودِ﴾ [البقرة: ١٢٥]
‘‘এবং আমরা ইবরাহীম ও ইসমা‘ঈল-কে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে তাওয়াফকারীদের, ই‘তিকাফকারীদের, রুকু ও সাজদাহকারীদের জন্য পবিত্র করে রাখে’’। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১২৫]
কা‘বা ও হজের ইতিহাসে রয়েছে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মহৎ ইসলামী আখ্যান। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তার স্ত্রী হাজের ও পুত্র ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালামকে মরুময়, পাথুরে ও জনশূন্য মক্কা উপত্যকায় রেখে আসার নির্দেশ দেন -এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ।
প্রচণ্ড পানির পিপাসায় ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালামের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, তাঁর মা ‘হাজের’ পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ৭ বার ছুটাছুটি করেন। অতঃপর জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে শিশু ইসমাঈলের জন্য সৃষ্টি করলেন সুপেয় পানির কূপ -যমযম। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহীম ও ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালাম দু’জনে যমযম কূপের পাশে ইবাদতের লক্ষে কা‘বার পুণঃনির্মাণ কাজ শুরু করলেন।
আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আনুগত্য দেখার জন্য আরেকটি পরীক্ষা নিলেন। তিনি ইবরাহীম আলাইহিসকে সালাম স্বপ্নে দেখালেন যে, তিনি তার পুত্রকে কুরবানি করছেন। আর এ স্বপ্নানুসারে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন বাস্তবে তার পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হলেন তখন আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন এবং ইবরাহীমের পুত্রের স্থলে একটি পশু কুরবানি করিয়ে দিলেন। সেই থেকে হজের সাথে সাথে চলে আসছে এ নিয়ম, মুসলিম বিশ্বে যা ঈদুল আযহা (কুরবানী ঈদ বা বকরা ঈদ) নামে পরিচিত।
ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পর পবিত্র কা‘বা বিভিন্ন জাতি-উপজাতির দখলে চলে আসে এবং তারা একে মুর্তি পূজার জন্য ব্যবহার করতে থাকে এবং এ সময়ে উপত্যকা এলাকায় মৌসুমী বন্যার কবলে পড়ে কা‘বা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
অতঃপর ৬৩০ খৃষ্টাব্দে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলিমগণ কা‘বার মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেন এবং কা‘বাকে পুনরায় আল্লাহর নামে উৎসর্গ করেন।
কুরাইশরা যখন কা‘বা পুণঃনির্মাণ করেন, তখন জান্নাত থেকে আসা পাথর ‘হাজারে আসওয়াদ’কে কা‘বার এক কোণে স্থাপন করা হয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে। কা‘বার এক পার্শ্বে একটি স্থান রয়েছে যার নাম ‘মাকামে ইবরাহীম’; এখানে দাঁড়িয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কা‘বার নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ করতেন, এখানে একটি পাথরে তাঁর পদছাপ রয়েছে। কা‘বা ঘরের উত্তর দিকে কা‘বা সংলগ্ন অর্ধ-বৃত্তাকার একটি উচু দেওয়াল আছে যা কা‘বা ঘরেরই অংশ যার নাম ‘হাতিম’ বা হিজর। হাজরে আসওয়াদ ও কা‘বা ঘরের দরজার মাঝের স্থানকে ‘মুলতাযাম’ বলা হয়। কা‘বা ঘরকে বৃষ্টি ও ধুলাবালীর থেকে রক্ষার জন্য একটি চাদর দ্বারা আবৃত করে রাখা হয় যা ‘গিলাফ’ নামে পরিচিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার অনুসারীরা যেসব পথে ঘুরে হজ পালন করেছেন এর মধ্যে রয়েছে; কা‘বা তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়া পর্বতের মধ্যে সা‘ঈ করা, মিনায় অবস্থান করা ও আরাফায় উকুফ করা এবং মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করা, জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ত্যাগের স্মৃতিচারণ ও আল্লাহর স্মরণকে বুলন্দ করার জন্য পশু যবেহ করা।
একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার; আল্লাহ তা‘আলা কা‘বার ভিতরে অবস্থান করেন না বা আমরা মুসলিমরা কা‘বার উপাসনা করি না বা কা‘বা থেকে কোনো বরকত হাসিল করা যায় না। কা‘বা হচ্ছে ‘কিবলা’ – যা মুসলিমদের জন্য দিক নির্ণায়ক ও ঐক্কের লক্ষ্য। আমরা মুসলিমরা সম্মিলিতভাবে কা‘বার দিকে মুখ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করি।
কা‘বার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও উচ্চতা:
উচ্চতা
মুলতাযেমের দিকে দৈর্ঘ্য
হাতিমের দিকে দৈর্ঘ্য
রুকনে ইয়েমানি ও হাতিমের মাঝে দৈর্ঘ্য
হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমানি মাঝে দৈর্ঘ্য
১৪ মি.
১২.৮৪মি.
১১.২৮মি.
১২.১১মি.
১১.৫২মি.
 
কা‘বা ও মক্কার ইতিহাস বিস্তারিত জানতে ‘পবিত্র মক্কার ইতিহাস: শাইখ ছফীউর রহমান মোবারকপুরী’ বইটি পড়ুন।

কোথায় যাচ্ছেন? আরো নতুন কিছু জানার জন্য এই লেখাটি পড়ুনঃ   জেনে নিই হজ্জ ও উমরা এর বিস্তারিত(পর্ব 3)।
MuslimPoint Organization

About MuslimPoint Organization

MuslimPoint একটি অনলাইন ভিত্তিক ইসলামী প্রশ্নোত্তর, গ্রন্থাগার, ব্লগিং, কুরআন, হাদিস, কুইজ এবং বিষয় ভিত্তিক রেফারেন্স প্ল্যাটফর্ম।

View all posts by MuslimPoint Organization →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *